May 25, 2026, 10:27 am
বর্তমান সভ্যতার জন্য রিসাইকেলিং একটি অধ্যাবশ্যকীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাগজ রিসাইক্লিং এর জ্বালানি সাশ্রয় এবং তেল পানি কম খরচের বিষয়টির জন্য এটি বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এতে করে পরিবেশ ও ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে। তাই পরিবেশ সুরক্ষায় কাগজ রিসাইক্লিং জরুরি হয়ে পড়েছে।
কাগজ মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাগজের ব্যবহার ছাড়া আধুনিক সভ্যতা কল্পনা করা যায় না । এমনও হয়ে থাকে যে দৈনিক রুটিন কাগজের ব্যবহার দিয়ে শুরু হয় এবং কাগজের ব্যবহার দিয়ে শেষ হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ কাগজের বর্জ্য তৈরি হয় আর এগুলি পরিবেশ দূষণ ঘটায়। ন্যাশনাল এনভারমেন্টাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এনইআরআই) নাগপুরের একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যায় যে, এক টন কাগজ উৎপাদনের জন্য ১৭ টি গাছের প্রয়োজন হয়।
এছাড়া যে কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়) প্রচুর পরিমাণে কাগজের বর্জ্য তৈরি হয়। এগুলোর পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব রোধ করতে এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়াররা কাগজের রিসাইক্লিং এর ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়াররা পৃথিবীর স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব এবং বিশ্বব্যাপী পরিবেশগত সমস্যার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিষ্পত্তি এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা গুলির সাথে জড়িত। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে 3R (Reduce, Reuse, Recycle) পদ্ধতি যার মধ্যে অন্যতম হলো কাগজ রিসাইক্লিং।
মূলত ১৯৪৭ এর পর এ দেশের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কাগজ শিল্পের বিকাশ ঘটে। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে কাগজ কলের সংখ্যা ছিল সর্বসাকুল্যে মাত্র দুটি। পঞ্চাশের দশকে কর্ণফুলী পেপার মিল ও খুলনা পেপার মিল সারাদেশের কাগজের চাহিদা মেটাত। ষাটের দশকের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠা পায়ে নর্থ বেঙ্গল পেপার মিল নামে আরো একটি রাষ্ট্র পরিচালিত কাগজ কল। লোকসানের মুখে সরকারি এসব কাগজ কল বন্ধ হয়ে গেলে বেসরকারি খাতে কাগজ কল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ৯০ এর দশকে। বর্তমানে দেশে সরকারি বেসরকারি ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১০৬ টি কাগজ কল রয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের তুলনায় বর্তমানে দেশে কাগজের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। সেই কাগজের যোগান দিতে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার বর্গ কিলোমিটার বন জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও দেশের চাহিদা মেটানো যাচ্ছেনা। দেশে উৎপাদিত কাগজ মোট চাহিদার কেবল ৬০%, মেটায় বাকি ৪০% বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
১৯৮০ দশকে ইন্টারনেট ও ইমেইলের ব্যবহার শুরু হবার পরেও ধারণা করা হয়েছিল যে অফিস-আদালতের কাগজের ব্যবহার অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এমনটা ঘটেনি। ইউরোপে চালানো এক সমীক্ষাও এটাকে সমর্থন করে যার পোশাকি নাম “ইন পেপার উই ট্রাস্ট” যার অর্থ “কাগজের উপরেই আমাদের আস্থা রয়েছে”।
ইলেকট্রনিক বিভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংরক্ষণের পরেও অনেক মানুষ পুরোপুরি নিশ্চিত হতে একটি প্রিন্ট নিয়ে রাখেন। এসব কারণে অর্থনৈতিক সংকটে কাগজের চাহিদা কমার বদলে বেড়ে যেতেও দেখা গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কাগজ ব্যবহারকারী চারটি দেশ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, চীন এবং জাপান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ৮ কোটি ৫০ লক্ষ টন কাগজ ব্যবহার করে যার মাথাপিছু বাৎসরিক হার প্রায় ৩০৮ কেজি। জার্মানিতে মাথাপিছু বাৎসরিক কাগজ ব্যবহারের হার প্রায় ২৩০ কেজি যা গোটা বিশ্বের গড় হারের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। জনসংখ্যার বিচারে এ প্রবণতা বিস্ময়কর।
অনিয়ন্ত্রিত কাগজ উৎপাদনে লাগাম এখনই টেনে ধরতে হবে এবং রিসাইক্লিং এর প্রতি উৎসাহ বাড়াতে হবে। কাগজ তৈরির প্রধান কাঁচামাল কাঠ ও বাঁশ। কাগজ তৈরির কাঠ ও বাসের যোগান দেওয়ার জন্য বছরে বছরে প্রচুর পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে, ধ্বংস করা হচ্ছে বনাঞ্চল। বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ অপর্যাপ্ত। বনভূমির ক্ষেত্রফল ২.৬ মিলিয়ন হেক্টর যা মোট ক্ষেত্রফলে ১৭.৪%। সরকার যেখানে বনভূমির পরিমাণ ২৪% করার লক্ষ্য নিয়েছে সেখানে কাগজ উৎপাদনের কাঁচামাল যোগান দিতে বৃক্ষনিধন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে এমন সব গাছ লাগানো হচ্ছে যা দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং কাগজ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল অত্যন্ত দ্রুত পাওয়া যায় । এসব কারণে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, নষ্ট হচ্ছে পশুপাখির আবাসস্থল। এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়াররা তাই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে কাগজ রিসাইক্লিং এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন।
পুরাতন বা কাগজের বর্জকের নতুন কাগজের পাল্পের সাথে মিশিয়ে কাগজ উৎপাদন করার প্রক্রিয়াকে রিসাইক্লিং বলে। ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া মোড়ানো কাগজ, পুরাতন ম্যাগাজিন, পুরনো খবরের কাগজ, অফিসের কাগজ, টেলিফোন ডাইরেক্টরি এবং বাসায় ব্যবহৃত অন্যান্য কাগজ হতে এর রিসাইকেল করা হয়। গবেষণা ভিত্তিক ওয়েবসাইট statista.com এর মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি কাগজ রিসাইকেল করা হয়। গবেষণা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে ৬৮% কাগজ রিসাইকেল করা হয় যা ১৯৩০ সালে ছিল মাত্র ৩৩%। এছাড়াও অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ওয়েলস এবং সুইজারল্যান্ডে ৫০% এর অধিক কাগজ রিসাইকেল করা হয়।
কাগজ রিসাইক্লিং এর পদ্ধতি- প্রথমে কাগজকে ডি-ইনকিং কিংবা কালি বিমোচন পদ্ধতি দ্বারা কাগজের কালি বিমুক্ত করা হয়।
কালি বিমক্ত কাগজকে চপেড করা হয় এবং মিশ্রণকে তাপ দেওয়া হয়। এতে লিগনিনের গঠন ভেঙে যায় এবং পাল্প তৈরি হয়। এরপর স্ক্রিন দ্বারা পাল্প থেকে আঠা অথবা অন্যান্য পদার্থ আলাদা করা হয়। এরপর বিরঞ্জিত করে পানিতে মেশানো হয়।
এই পাল্প দিয়েই নতুন কাগজ তৈরি হয়।
রিসাইকেল করা কাগজ দিয়ে টয়লেট টিস্যু, ন্যাপকিন, নিমন্ত্রণপত্র, কার্ডবোর্ড, ম্যাগাজিন, ডিমের কার্টুন, বইয়ের মলাট, মোড়ক ইত্যাদি তৈরি করা হয়। কাগজ রিসাইক্লিং এর বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে । এক টন খবরের কাগজ রিসাইকেল করলে প্রায় এক টন কাঠ বেঁচে যায় আর এক টন প্রিন্টেড কাগজ রিসাইকেল করলে ২ টন কাঠ বেঁচে যায়।
রিসাইক্লিং-এর ক্ষেত্রে পানি দূষণও কাগজ তৈরিতে দূষণের চেয়ে কম হয়। কাগজের রিসাইকেলের ফলে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পায়, গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস পায় এবং সর্বোপরি পরিবেশ দূষণ কম হয়। কাঁচামাল থেকে কাগজ উৎপাদনের চেয়ে রিসাইটিং এর ক্ষেত্রে ৪০-৬০% জ্বালানি সাশ্রয় হয়। নতুন কাগজ উৎপাদনের তুলনায় রিসাইক্লিং এ পানি দূষণ ৩৫% কম এবং বায়ু ৭৪% কম দূষণ হয়। এক টন রিসাইকেল করা কাগজ ১৭ টি গাছ, ৭০০০ গ্যালন পানি, ৩৮০ গ্যালন তেল, ৩২ কিউবিক ইয়ার্ড ল্যান্ডফিল স্পেস এবং চার হাজার কিলোওয়াট শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে চীন জাপান কাগজের রিসাইকলিং এর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কাগজ রিসাইকেল করে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিদেশেও রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ কেউ কাগজ রিসাইকেলিং এর ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি কতগুলো সংগঠন নিজস্ব রিসাইক্লিং সেন্টারে কাগজ রিসাইক্লিং শুরু করেছে। সরকারও এদিকে সুনজর দিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
লেখক,
মাকসুদুল হাসান মাহফুজ
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়